বাংলাদেশ ক্রিকেটের বড় নাম মুস্তাফিজুর রহমান। তাঁর পারফরম্যান্স, কাটার আর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বরাবরই আলোচনায় থাকে। ২০২৬ সালে এসে তাঁকে কেন্দ্র করে আবারও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আইপিএলের দল Kolkata Knight Riders থেকে মুস্তাফিজকে স্কোয়াডের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম ১০০ শব্দেই বললে, মুস্তাফিজুর রহমান ইস্যু এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট, আইপিএল এবং বিশ্বকাপ পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে গেছে।
কেকেআর ও বাংলাদেশি সমর্থকদের আবেগের ইতিহাস
আইপিএলের দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত কেকেআর। এর পেছনে বড় কারণ, একসময় নিয়মিত এই দলে খেলেছেন সাকিব আল হাসান, পরে লিটন দাসও সুযোগ পেয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজকে দলে নেওয়ার খবর বাংলাদেশি সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, ২০২৬ মৌসুমে কেকেআরের জার্সিতে মুস্তাফিজের কাটার আবার আইপিএল মাতাবে।
হঠাৎ সিদ্ধান্ত ও পোস্ট মুছে ফেলার প্রতিক্রিয়া
কিন্তু বাস্তবতা বদলে যায় দ্রুত। Board of Control for Cricket in India-এর নির্দেশে মুস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে ঘিরে কেকেআরের অফিসিয়াল ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে দেওয়া সব পোস্টও মুছে ফেলা হয়। এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করে বাংলাদেশি সমর্থকদের। তাঁদের অভিযোগ, খেলোয়াড়কে দলে না রাখার সিদ্ধান্ত আলাদা বিষয়, কিন্তু আগের সব কনটেন্ট মুছে ফেলা সম্মানজনক নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আনফলো’ ঝড়
এই সিদ্ধান্তের পরপরই কেকেআরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরকাড়া পরিবর্তন দেখা যায়। একসময় যেসব বাংলাদেশি সমর্থক নিয়মিত কেকেআরের কনটেন্ট শেয়ার করতেন, তাঁরাই দলবদ্ধভাবে পেজ আনফলো করতে শুরু করেন। গত ২৪ ঘণ্টা আগে কেকেআরের ফলোয়ার ছিল ১ কোটি ৮১ লাখ ১০ হাজারের বেশি। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত প্রায় ১ লাখেরও বেশি ফলোয়ার কমে গেছে। শুধু কেকেআর নয়, অনেকেই আইপিএল ও বিসিসিআইয়ের অফিসিয়াল হ্যান্ডেলও আনফলো করছেন।
আইপিএল জনপ্রিয়তায় সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ আইপিএলের বড় বাজার। টিভি রেটিং থেকে শুরু করে ডিজিটাল এনগেজমেন্টে বাংলাদেশি দর্শকদের অবদান কম নয়। এই ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ দীর্ঘ হলে আইপিএলের ব্র্যান্ড ভ্যালুতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও Indian Premier League কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি, তবে পরিস্থিতি যে তারা নজরে রাখছে, তা স্পষ্ট।
বিশ্বকাপের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্বস্তি
মুস্তাফিজ ইস্যু শুধু আইপিএলেই সীমাবদ্ধ নেই। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে আলোচনা এখন আরও জোরালো। বাংলাদেশ দলের চারটি গ্রুপ ম্যাচই ভারতের ভেন্যুতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি নতুন করে ভাবছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
বিসিবির অবস্থান ও আইসিসির ভূমিকা
রবিবার ঢাকায় জরুরি বৈঠকের পর Bangladesh Cricket Board জানায়, তারা নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ভারতের কিছু ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন নিয়ে তাদের উদ্বেগ আছে। এ কারণে ম্যাচগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে International Cricket Council-এর কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইসিসিও বিষয়টি একেবারে নাকচ করছে না বলে জানা গেছে।
গ্রুপ ‘সি’ ও বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ
২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ পড়েছে ‘সি’ গ্রুপে। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পাশাপাশি আছে নেপাল ও ইতালি। কাগজে-কলমে গ্রুপটি কঠিন হলেও বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ভালো শুরু করা।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ম্যাচগুলো
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ভেন্যু হিসেবে নির্ধারিত ছিল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী Eden Gardens। একই মাঠে পরের দুই ম্যাচে ইংল্যান্ড ও ইতালির মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুম্বাইয়ে নেপালের বিপক্ষে খেলার সূচি ছিল বাংলাদেশের।
নিরাপত্তা শঙ্কা ও সূচি পরিবর্তনের সম্ভাবনা
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বিসিবি ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারে। নিরাপত্তা ঝুঁকি, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সমর্থকদের আবেগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। আইসিসি চাইছে সব দলের জন্য সমান ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। তাই এক–দুই দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুস্তাফিজ প্রসঙ্গ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
মুস্তাফিজ শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট পরিচয়ের অংশ। তাঁকে ঘিরে যে কোনো সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই আবেগ তৈরি করে। কেকেআরের সিদ্ধান্তে সেই আবেগ ক্ষোভে রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের আগে এই ইস্যু বাংলাদেশ দলের মনোযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক ক্রিকেটাররা।
ডিজিটাল যুগে সমর্থকদের শক্তি
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, ডিজিটাল যুগে সমর্থকদের শক্তি কতটা বড়। ফলোয়ার কমা শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি বার্তা। দল ও বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্তে সমর্থকদের অনুভূতি যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রশ্ন–উত্তর
প্রশ্ন: মুস্তাফিজকে কেন কেকেআর স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হলো?
উত্তর: বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা ও পরিস্থিতিগত কারণে কেকেআর মুস্তাফিজকে স্কোয়াডে রাখেনি বলে জানা গেছে।
প্রশ্ন: কেকেআরের ফলোয়ার কেন কমছে?
উত্তর: মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর তাঁর সব পোস্ট মুছে ফেলায় বাংলাদেশি সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে আনফলো করছেন।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপের সূচি কি বদলাতে পারে?
উত্তর: নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে বিসিবি আইসিসির কাছে ম্যাচ ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন করেছে, তাই সম্ভাবনা আছে।
প্রশ্ন: আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে আসতে পারে?
উত্তর: আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষ হলে এক–দুই দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপসংহার
২০২৬ সালে এসে মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক প্রমাণ করে, ক্রিকেট শুধু খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আবেগ, রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল প্রভাবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কেকেআরের সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা আইপিএল ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলো কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং বিশ্বকাপের আগে এই অস্থিরতা কত দ্রুত কাটে।
